সাহিত্য ও সংস্কৃতি

গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:- মোস্তফা কামাল (পর্ব ৩০)

(পর্ব ৩০)

রিজু আজ সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। এপাশ ওপাশ করে রাত ভোর হয়। খুব সকালে উঠে হোন্ডা মোটর বাইকে চেপে বসে। স্টার্ট দেয়। দ্রুত গতিতে গাড়ি ছোটে। একেকটা মিনিট তার কাছে একেক ঘন্টা মনে হয়। রাস্তা যেন আজ ফুরোতে চায়না। একসময় পূর্ব পাড়া ভানু পিসিমার বাড়ি পৌঁছে যায়। ওর তর আর সইছে না। বাইরে গাড়িটা কোনোরকমে স্ট্যান্ড করে দ্রুত বাড়িতে ঢুকে যায়। আগে এই বাড়িতে ঢুকতে রিজুর কোনো অনুমতি লাগেনি। ও আজও মনে করে এই বাড়িতে ঢোকা তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

ভানু কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পাশেই বুড়িয়ে যাওয়া একটি মেয়ে মাথায় ওড়না দিয়ে শুনছিলো। হঠাৎ ই একটা প্রায় বয়স্ক মানুষ দেখে ভানু চমকে ওঠেন। একটু ইতস্তত বোধ করেন। ঘোমটাটা লম্বা করে টেনে মুখটা ঢেকে নেন। কোরআন শরীফটা বন্ধ করে রেহেলের উপর রাখেন। অপরিচিত লোককে দেখে পাশে বসা মেয়েটি এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে যায়।

……..পিসিমা, আমি রিজু! আমাকে চিনতে পারছেন না?

ভানু চমকে ওঠেন। বলেন, রিজু! তোমার একি চেহারা হয়েছে বাবা! কতদিন তোমাকে দেখিনি। এসো বাবা,বসো! বসো এখানে। আমার পাশে বসো।

…….. হ্যাঁ পিসিমা। গতকাল আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর সারারাত আমার ঘুম আসেনি। ফজরের নামাজ পড়েই বেরিয়ে পড়েছি।

রিজুর কপালে স্নেহের হাত বুলিয়ে দেন ভানু। তিনি যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না তার সঙ্গে আজ রিজু দেখা করতে এসেছে। সত্যিই কি রিজু! ভানুর রিজু! ভানুর চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়।

……. তুমি এমনটি কেন হয়েছো বাবা? কতো সুন্দর দেখতে ছিলে। কী সুন্দর ছিল গায়ের রং! সুঠাম গঠন। কিন্তু আজ এ কোন রিজুকে দেখছি আমি!

……. এখন বয়স হয়েছে পিসিমা।শরীর কি আর সারাজীবন একই থাকবে?

…… না বাবা থাকবে না। কিন্তু তোমার এই চেহারা তো সুখের চেহারা নয় বাবা।

…… থাকনা পিসিমা এসব কথা। আপনার শরীরটাও তো একেবারেই ভেঙে পড়েছে।

…… আমার দুঃখের জীবন বাবা! দুঃখ নিয়েই বেঁচে থাকি। নিজের কষ্টের জন্য তো আর কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। কিন্তু অন্যকে কষ্ট দিলে বাবা জীবন ভরে তার অভিশাপ মাথায় নিয়ে চলতে হয়। আমার কপালে তো দুঃখ ছাড়া আর কিছু নেই। এতো যন্ত্রণা যাকে বয়ে বেড়াতে হয় তার শরীর তো ভাঙ্গবেই বাবা। আমার কষ্ট গুলো যদি কাগজ হতো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতাম। কিন্তু কষ্ট গুলো হলো আগুন, যা প্রতিদিন আমাকেই কাগজের মত পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে বাবা।

……. ভানুর কথাগুলো রিজুকে বিদ্ধ করে। রিজু লজ্জিত হয়। জিজ্ঞেস করে, পিসিমা, শালিনী কোথায়? ও কেমন আছে?

……… ও তোমাকে দেখে ঘরে ঢুকে পড়েছে। হতভাগী হয়তো চোখের জলে বালিশ ভেজাচ্ছে।

শালিনীকে ভানু ডাকেন। ও আসেনা। ঘর থেকে একটা চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে।

রিজু আর অপেক্ষা করে না। দৌড়ে সটান ঘরে ঢুকে যায়। দেখে উপুড় হয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছে সেই বুড়িয়ে যাওয়া মেয়েটি। রিজুর বুঝতে বাকি রইলো না, ওই শালিনী। রিজু শালিনীর মাথায় হাত রাখে । মুখ তুলে তাকায় শালিনী। কিছু বলতে পারে না। শুধু দুই চোখ দিয়ে অবিরত জল চুঁইয়ে পড়ে। জল আজ বাঁধন হারা। রিজুর চোখেও জল। দুজনেই খানিকক্ষণ নীরব। শালিনী উঠে বসে। রিজু ওর হাত দুটো চেপে ধরে। বলে আমাকে ক্ষমা করো শালিনী। শালিনী নিজেকে স্থির রাখতে পারেনা। রিজুর বুকে মাথা গুঁজে কান্নায় ফেটে পড়ে। এ কান্না কিছুতেই থামেনা। শালিনীর রুক্ষ শুষ্ক চুলে হাত বুলিয়ে দেয় রিজু।

রিজুর স্পর্শে শালিনীর আবেগের বাঁধ ভাঙ্গে। বুকে প্লাবন আসে। পঁচিশ বছর আগে এই ভাবে শালিনী রিজুর বুকে মাথা রেখে স্বপ্নের জাল বুনতো। রিজুর জন্য এখনো স্বপ্নের জাল বোনে শালিনী। তার বিশ্বাস ছিল রিজু একদিন তার কাছে ফিরে আসবেই। সেই আশায় স্বপ্নের ছিন্নজাল নতুন করে বারবার জোড়া দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। আজ সেই রিজু তার কাছে। তার কাছে স্বপ্ন মনে হয়। এ যেন পরম পাওয়া। এ এক পরম তৃপ্তি। পরম সুখ। শালিনী মুখ তুলে তাকায় রিজুর দিকে। চোখে চোখ রাখে।

রিজু বিশ্বাস করতে পারে না এই তার সেই শালিনী। কী দুরাবস্থা হয়েছে চেহারার! তুলতুলে গালদুটো বসে গেছে। ডাগর চোখের মিষ্টি চাহনি আর নেই। চোখ দুটো কোটরাগত। যত্নের অভাবে রেশমি চুলগুলো রুক্ষ শুষ্ক। কথা বলতে পারে না রিজু। ঠোঁট দুটো কেঁপে যায়। শালিনীর এই অবস্থার জন্য সেই তো দায়ী। বড়ো মায়া হয় তার।

…….. তোমার সুখের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারবো বলেছিলাম কিন্তু তার জন্য যে তোমাকেই ত্যাগ করতে হবে, এটা আমি কখনো ভাবিনি রিজু ! তোমার কেন এই হাল হয়েছে ? তোমার সুখের সংসারে আমি তো কোনো কষ্ট দিইনি তোমাকে। তোমাকে বুঝতেও দিইনি আমি কেমন আছি। নিজেকে একেবারেই গুটিয়ে রেখেছি। তুমি কষ্ট পাবে বলে! তবে কেন এই দুরাবস্থা তোমার? চুলে পাক ধরেছে, হাতের সব শিরা উপশিরা দেখা যাচ্ছে। এতো জীর্ণ শীর্ণ হয়েছো কেন? তোমার সংসার আছে, ছেলে মেয়ে আছে, চাকরি আছে। কোনো কিছুর অভাব নেই ! তবুও কেন এই অবস্থা?

……… রিজু কিছু বলতে পারে না। কী করে শালিনীকে বলবে,সে ভালো নেই। পৃথিবীর মানুষগুলো তাকে যে নিরন্তর অসহায় করে তুলেছে।

…….. রিজু? কথা বলো!

…… ওসব কথা থাক শালিনী। চলো আমার সঙ্গে।

……… কোথায়?

…….. তোমার বাড়ি।

……… আমার বাড়িতেই তো আছি।

……. না, এটা তোমার বাড়ি নয়। তোমার নিজের বাড়িতে চলো।

…..কি সব পাগলের মতো কথা বলছো!

…… হ্যাঁ, আমি ঠিকই বলছি। সেদিন যেটা পারিনি সেটা আজ করে দেখাবো।

…..কি করবে তুমি?

……. আমি প্রায়শ্চিত্ত করবো!

…….. প্রায়শ্চিত্ত?

…….হ্যাঁ, প্রায়শ্চিত্ত!

….. কিভাবে?

…….. তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে!

…… না না রিজু, সেটা হয়না। তোমার সংসার রয়েছে, বড়ো বড়ো সন্তান রয়েছে! তোমার সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। আমার সুখের জন্য তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নিলে তোমার সম্মান নষ্ট হবে। সেটা আমি করতে পারবোনা।

…… শালিনী!

……. হ্যাঁ রিজু। তোমার কষ্ট হোক আমি তা কোনদিন চাইনি। এখনো চাইনা। আমাকে বিয়ে করলে তুমি অশান্তির আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। সমাজের কাছে তুমি ছোট হয়ে যাবে। তুমি এসব সহ্য করতে পারবেনা। মিতাদিও তোমাকে ভুল বুঝবে। প্লিজ তুমি আমাকে ভুল বুঝোনা। আমি পারবোনা। আমার পোড়া কপালে সুখ সইবে না। এভাবেই দূরে থেকে তোমার স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো। তুমি চিন্তা করো না। তুমি ফিরে যাও রিজু!

হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে শালিনী। রিজু কোনো কথা বলতে পারে না। ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা রিজুর জানা নেই। ভানু ঘরে ঢুকে শালিনীর উদ্যেশ্যে বলেন, কাঁদ হতভাগী কাঁদ! কেঁদে কেঁদে একটু হালকা হো। আমি আর পারছিনা রিজু! রিজুর পিঠে হাত বুলান ভানু। বলেন, আমার মেয়ের এই অবস্থার জন্য তোমাকে কোনদিন আমি দায়ী করিনি বাবা। এটা ওর কপালের লিখন। কেউ খণ্ডাতে পারবেনা। তুমি পাগলামী করোনা বাবা। বাড়ি ফিরে যাও।

….. না পিসিমা, আমাকে আজ খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েন না! আজ পঁচিশটি বছর ধরে শালিনীর জন্য নীরবে অনেক কেঁদেছি! যে কান্না হয়তো মরণ হলে শেষ হবে! আমি আজও শালিনীকে আগের মতই ভালোবাসি! ওকে ভুলতে পারবোনা! আমার যন্ত্রণার কথা আপনি না বুঝলে কে বুঝবে! আমি আপনার ছেলে পিসিমা।

……….কলিজায় জায়গা দেওয়া মানুষগুলোই একসময় কলিজায় আঘাত করে চলে যায় বাবা। এটাই বাস্তবতা। তোমার উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই । ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কেন! আর যদি কিছু ভুল করেই থাকো আমি তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি বাবা।

…….. পিসিমা আপনি অনুমতি দিন, আমি শালিনীকে স্বীকৃতি দিতে চাই।

…… না বাবা তা হয়না। তোমার বাবা মা আছেন, স্ত্রী আছে, সন্তান সন্ততি আছে। তাদের সম্মতি ছাড়া আমি পারবোনা।

…… আমি প্রতিষ্ঠিত পিসিমা। আমার স্বাধীনতায় আর কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবেনা। আপনার বৌমাকে আমি বুঝিয়ে বলবো। ওরা দুই বোনে একসাথে থাকবে। কোনো অসুবিধা হতে দেবোনা।

……. তুমি আগে তোমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলো। সে যদি রাজি থাকে তাহলে আমি আপত্তি করবোনা। কিন্তু বাবা দেখো,যেন তোমার সংসারে অশান্তি না হয়।

…… হবে না। মিতা খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে। ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমার কষ্টে ও কষ্ট পায়। আমার সুখে ও সুখী হয়। ও ঠিক বুঝবে পিসিমা।

….. তাই যেন হয় বাবা। তোমাকে আমি কোনদিনই শালিনীকে চাপিয়ে দিতে চাইনি। শুধু তোমার কথা ভেবে, তোমার কষ্টের কথা ভেবে আমি এই টুকু বলতে পারি তুমি যদি শালিনীকে এই শেষ লগ্নে একটু পায়ের তলায় জায়গা দাও তাহলে হতভাগী একটু শান্তি পায়। সেই পঁচিশটি বছর ধরে তোমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। জেনে রেখো বাবা, আমরা গরীব মানুষ কিন্তু আত্মসম্মান আছে। এটুকুই আমাদের বেঁচে থাকার ভরসা। তা যেন নষ্ট না হয় বাবা দেখো।

….. আচ্ছা পিসিমা। আপনি ভরসা রাখুন। আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আপনার সম্মান রক্ষা করবো। শালিনীর সব দুঃখ কষ্ট আমরা সবাই ভাগ করে নেবো। আমি বাড়ি ফিরে মিতাকে রাজি করাবো। একসপ্তাহের মধ্যে আবার আসবো পিসিমা। আপনি শালিনীকে তৈরি করে রাখবেন। আমার হাত ধরে সম্মানের সঙ্গে শালিনী নিজের বাড়িতে যাবে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শালিনী যেন বসন্তের দেখা পেতে চলেছে। আনন্দে ওর চোখ দুটো আশার আলোয় জ্বলে উঠে। ঠোঁটের কোণে হাসির ঝলক খেলে যায়। শুষ্ক হৃদয়ে জোয়ার আসে। তার মনে হয়,ছিন্ন জালের বুননে এবার হয়তো সংসারের দেখা মিলবে। সে আপন করে পাবে তার রিজুকে। খুব আপনার করে। মিতাদিকেও খুব সম্মান করবে। দুজন মিলে রিজুর সব দুঃখ কষ্ট দূর করে দেবে। রিজু হবে তাদের দুজনের। শালিনীর আজ নিজেকে খুব হালকা লাগছে। আটকে যাওয়া বড়ো বোঝাটা মাথা থেকে নামতে চলেছে। অবহেলায়, অনাদরে কাটানো দুর্বিষহ জীবনের কথা মুহূর্তে ভুলে যায় সে। রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে। মনে বসন্তের ফুল ফোটে। রিজুর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আজ রিজুর চোখে যেন গোটা পৃথিবী দেখতে পায় শালিনী।

বারবার রিজুর মোবাইলটা বেজে উঠছে। মিতা ফোন করছে। মিতা জানেনা রিজু আজ শালিনীর কাছে এসেছে। খুব ভোরে ও ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওকে বলা হয়নি। বললে রিজুর উপর রাগ করতো। সংসারে অশান্তি হতো। রিজুর বিশ্বাস, মিতা যতই রাগ দেখাক না কেন ওকে একটু ভালোবেসে কথা বললেই তার সব রাগ মাটি হয়ে যায়। রিজুর কোলে মাথা লুকায়।

বহরমপুর ফেরার জন্য গাড়ি স্টার্ট দেয় রিজু। ভানু রিজুর কপালে চুমু দেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। শালিনী ফোন নম্বর দেয়। হাত নেড়ে বিদায় জানায়। বলে, তোমার অপেক্ষায় রইলো তোমার শালিনী! রিজু মিষ্টি হাসে। বলে, তুমি তৈরি থেকো শালিনী। আমি আসছি। রিজু গাড়িতে পিক আপ দিয়ে গিয়ারে ফেলে। চোখের পলকে শালিনীর আড়াল হয়ে যায়।

Related Articles

Back to top button
error: